সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি · ক্যাশ অন ডেলিভারি ও bKash
সব লেখা

প্যারেন্টিং

পরীক্ষার ভয় দূর করার উপায়: মানসিক চাপে অভিভাবক কী করবেন, কী করবেন না

নীলঘুড়ি টিম ৭ মিনিটতথ্য যাচাইকৃত ও নির্দেশিকা সমর্থিত

পরীক্ষার আগে বাচ্চার পেটব্যথা, ঘুম না আসা, খিটখিটে মেজাজ? স্বাভাবিক নার্ভাসনেস আর বাড়তি চাপ চেনার উপায় আর বাসায় যা করবেন, তার বাস্তব গাইড।

পরীক্ষার আগের সকালে মেয়ে নাশতা খেতে চাইছে না, বলছে পেট ব্যথা করছে। ছেলে রাত একটা পর্যন্ত বই খুলে বসে আছে, অথচ পাতা উল্টাচ্ছে না। কেউ কেউ আবার কিছুই বলে না, শুধু খিটখিটে হয়ে যায়। আপনি বুঝতে পারছেন কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু কী বলবেন, কতটা চাপ দেবেন, সেটা নিয়ে দ্বিধায় আছেন।

পরীক্ষার ভয় দূর করার উপায় খুঁজতে গিয়ে প্রথমে একটা কথা মনে রাখা দরকার: পরীক্ষার আগে একটু নার্ভাস লাগা খুব স্বাভাবিক। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) বলছে, পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, আর আসল কাজ হলো এই নার্ভাসনেসকে ভালো কাজে লাগানো। সমস্যা হয় যখন ভয়টা এত বেড়ে যায় যে ঘুম, খাওয়া আর রোজকার জীবন এলোমেলো হয়ে পড়ে।

এই লেখায় দেখব কীভাবে চাপের লক্ষণ চিনবেন, বাসায় কী করলে আসলে কাজে লাগে, কোন কথাগুলো না বলাই ভালো, আর কখন একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।

স্বাভাবিক নার্ভাসনেস, না বাড়তি চাপ?

পরীক্ষার আগের দিন একটু অস্থির লাগা, বারবার বই উল্টানো, রাতে ঘুম আসতে দেরি, এগুলো অনেক বাচ্চারই হয়। পরীক্ষা শেষ হলে সাধারণত এগুলো চলে যায়।

যে লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখবেন

NHS-এর তালিকা অনুযায়ী চাপে থাকা বাচ্চা বা কিশোর:

  • অনেক বেশি দুশ্চিন্তা করে, টানটান হয়ে থাকে
  • মাথাব্যথা বা পেটব্যথার কথা বলে
  • ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না
  • খিটখিটে হয়ে যায়
  • আগে যা ভালো লাগত, তাতে আগ্রহ হারায়

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের উদ্বেগ সবসময় ভয় হিসেবে দেখা দেয় না; রাগ, খিটখিটে মেজাজ, ক্লান্তি বা শরীরের অভিযোগ হিসেবেও আসতে পারে। আবার কিছু বাচ্চা দুশ্চিন্তা নিজের মধ্যেই চেপে রাখে, তাই লক্ষণ সহজে চোখে পড়ে না। ক্লাস থ্রির বাচ্চা হয়তো শুধু বলবে "স্কুলে যাব না", আর ক্লাস নাইনের কিশোর হয়তো দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে।

পরীক্ষার ভয় দূর করার উপায়: বাসায় যা করবেন

আগে শুনুন, পরে পরামর্শ

ইউনিসেফ অভিভাবকদের সহানুভূতি নিয়ে সন্তানের কথা শুনতে বলে, আর NHS বলছে জিজ্ঞেস করুন আপনি কীভাবে পাশে থাকতে পারেন। "এত ভয়ের কী আছে" বা "কান্না থামাও" বললে অনুভূতি চলে যায় না, বরং বাচ্চা নিজেকে আরও একা মনে করতে পারে। তার বদলে বলুন, "বুঝতে পারছি তোমার টেনশন হচ্ছে। কোন অংশটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা?"

ঘুম কাটছাঁট করবেন না

পরীক্ষার মৌসুমে প্রথম কোপটা পড়ে ঘুমের ওপর। অথচ আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন (AASM) ৬ থেকে ১২ বছরের বাচ্চার জন্য প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেয়, আর NHS বলছে বেশির ভাগ কিশোরের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম দরকার। NHS আরও বলছে, ঘুমের আগে আধা ঘণ্টা মতো মন শান্ত করার সময় দিন, আর পরীক্ষার আগের রাতে সারারাত জেগে পড়া সাধারণত খারাপ সিদ্ধান্ত।

খাবার আর নড়াচড়া

NHS সুষম খাবারের ওপর জোর দেয়, আর বলে অনেক অভিভাবক দেখেছেন বেশি চিনি, চর্বি আর ক্যাফেইনযুক্ত খাবার-পানীয়ে বাচ্চা অস্থির ও খিটখিটে হয়ে যায়। তাই পরীক্ষার রাতে চা-কফি আর এনার্জি ড্রিংকের বদলে পানি, ফল, ঘরের খাবার রাখুন। ব্যায়ামও চাপ কমায়; হাঁটা, সাইকেল, ফুটবল, যা-ই হোক। সন্ধ্যায় দশ-পনেরো মিনিট ছাদে হাঁটা পড়ার সময় নষ্ট না।

শ্বাসের সহজ একটা কৌশল শেখান

ইউনিসেফের অভিভাবকদের জন্য পাতায় একটা সহজ পদ্ধতি আছে: ধীরে গভীর শ্বাস, নাক দিয়ে নেওয়ার সময় ৫ পর্যন্ত গোনা আর মুখ দিয়ে ছাড়ার সময় ৫ পর্যন্ত গোনা, দুই-তিন মিনিট ধরে। ছোট-বড় সবাই এটা চেষ্টা করতে পারে। পরীক্ষার আগের রাতে একসাথে কয়েকবার অনুশীলন করুন, যেন পরীক্ষার হলে প্রশ্ন দেখে মাথা ফাঁকা লাগলে কাজে লাগাতে পারে।

পড়াটা ছোট ছোট ভাগে

পুরো সিলেবাস একসাথে চোখের সামনে থাকলে ভয় বাড়ে। NHS পরামর্শ দেয়, রিভিশনের একটা বাস্তবসম্মত সময়সূচি বানাতে সাহায্য করুন, আর জিজ্ঞেস করুন আপনি কীভাবে পাশে থাকতে পারেন। প্রতিদিনের পড়া কীভাবে ভাগ করবেন, তার ক্লাসভিত্তিক নকশা আছে আমাদের পড়াশোনার রুটিন গাইডে। পড়তে বসলেই মন উড়ে গেলে দেখুন পড়ায় মনোযোগ বাড়ানোর উপায়।

কী করবেন, কী এড়াবেন

করবেনএড়াবেন
"তুমি চেষ্টা করছ, সেটাই দেখছি" বলুনকাজিন বা পাশের বাসার বাচ্চার সাথে তুলনা
পরীক্ষার পর জিজ্ঞেস করুন কোনটা ভালো হয়েছেহল থেকে বেরোতেই প্রশ্নপত্র মিলিয়ে ভুল ধরা
ঘুম, খাবার আর একটু খেলার সময় ঠিক রাখুনপরীক্ষার আগের রাতে সারারাত জাগা
আত্মীয়দের রেজাল্ট নিয়ে প্রশ্ন ভদ্রভাবে থামান"জিপিএ না পেলে মুখ দেখাবি না" ধরনের হুমকি
পরীক্ষার সপ্তাহে ঘরের কাজ একটু কমিয়ে দিননিজের টেনশন বাচ্চার সামনে ঢেলে দেওয়া

NHS-ও বলছে, বাচ্চার কথা শুনুন, পাশে থাকুন, সমালোচনা এড়িয়ে চলুন। প্রতিটা পরীক্ষার পর কঠিন প্রশ্ন নিয়ে না ভেবে যা ভালো হয়েছে সেদিকে মন দিতে সাহায্য করুন, যাতে পরের পরীক্ষার জন্য মাথা পরিষ্কার থাকে। পরীক্ষার সময় ঘরের টুকটাক কাজ একটু কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শও তাদের।

বিশেষ করে অঙ্ক নিয়ে ভয় থাকলে আলাদা করে পড়ুন গণিত ভীতি দূর করার উপায়।

পরীক্ষার আগের রাত আর সকাল

  • আগের রাতে ব্যাগ, প্রবেশপত্র, কলম, পেনসিল, জ্যামিতি বক্স আর পানির বোতল গুছিয়ে রাখুন।
  • রাতে নতুন অধ্যায় শুরু না করে শুধু চোখ বুলিয়ে নেওয়া।
  • ঘুমের আগে ফোন অন্য ঘরে। AAP ঘুমের আগে স্ক্রিন-ফ্রি সময় রাখার পরামর্শ দেয়।
  • সকালে হালকা কিন্তু পেট ভরা নাশতা, তাড়াহুড়ো এড়াতে হাতে সময় নিয়ে বের হওয়া।
  • হলের গেটে শেষ মুহূর্তে "এটা পড়েছিস তো?" না বলে একটা ছোট্ট "তুমি পারবে" বলুন।

ফলাফলের দিনটাও গুরুত্বপূর্ণ

ফল যেমনই হোক, প্রথম প্রতিক্রিয়াটা বাচ্চা অনেকদিন মনে রাখে। প্রথমে জিজ্ঞেস করুন ও নিজে কেমন বোধ করছে। ফল খারাপ হলে পরের দিন ঠান্ডা মাথায় বসে দেখুন কোথায় সমস্যা ছিল: পড়ার পদ্ধতি, সময়, নাকি বিষয়টাই বুঝতে পারেনি। বড় বোর্ড পরীক্ষার বছরে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আছে এসএসসি ও এইচএসসি প্রস্তুতিতে অভিভাবকের ভূমিকা লেখায়।

কখন চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

এই লেখা কোনো রোগ নির্ণয়ের জন্য না। NHS বলছে, বাচ্চার উদ্বেগ বা মন খারাপ যদি তীব্র হয়, দীর্ঘদিন থাকে আর রোজকার জীবনে বাধা দেয়, তাহলে সাহায্য নিন; চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ভালো প্রথম ধাপ। CDC-ও বলছে, শিশুর আচরণ নিয়ে চিন্তা থাকলে শিশুর চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।

যেসব ক্ষেত্রে দেরি করবেন না:

  • পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুম, খাওয়া বা মেজাজ ঠিক হচ্ছে না
  • বারবার পেটব্যথা বা মাথাব্যথা, অথচ স্কুলে যাওয়ার দিনেই বেশি
  • বন্ধু, পরিবার, পছন্দের কাজ থেকে একেবারে গুটিয়ে যাওয়া
  • নিজেকে আঘাত করা বা বেঁচে থাকতে না চাওয়ার কথা বলা

শেষ লক্ষণটা দেখলে এক মুহূর্ত দেরি না করে সাথে সাথে চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালের সাহায্য নিন, আর বাচ্চাকে একা রাখবেন না। জরুরি বিপদে ৯৯৯-এ ফোন করুন। কথা বলার জন্য কান পেতে রই-এর হেল্পলাইন (০৯৬১২-১১৯৯১১, প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৩টা) আছে; যাওয়ার আগে নম্বর ও সময় একবার দেখে নিন। শিশু বিশেষজ্ঞ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা মানে দুর্বলতা না, এটা যত্ন নেওয়া।

প্রশ্নোত্তর

পরীক্ষার আগে বাচ্চার পেটব্যথা কি সত্যি, নাকি ভান?

উদ্বেগ থেকে সত্যিই পেটব্যথা বা মাথাব্যথা হতে পারে; NHS আর CDC দুটোই এগুলোকে চাপের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে। তাই "ভান করছিস" না বলে আগে গুরুত্ব দিন। ব্যথা বারবার হলে বা অন্য উপসর্গ থাকলে শিশুর চিকিৎসককে দেখিয়ে নিন, যেন অন্য কোনো কারণ বাদ পড়ে না যায়।

পরীক্ষার আগের রাতে কয় ঘণ্টা পড়া উচিত?

নির্দিষ্ট ঘণ্টার চেয়ে জরুরি হলো সময়মতো ঘুমানো। NHS বলছে সারারাত জেগে পড়ার চেয়ে ঘুম অনেক বেশি উপকারী। আগের রাতটা নতুন কিছু শেখার জন্য না, হালকা রিভিশনের জন্য রাখুন।

বাচ্চাকে পুরস্কারের লোভ দেখানো কি ঠিক?

ফলের বিনিময়ে বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি কারও কারও চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে, কারণ তখন ভালো না করলে দুটো জিনিস হারানোর ভয়। তার চেয়ে চেষ্টার পর ছোট আনন্দ রাখুন: পরীক্ষা শেষে পছন্দের খাবার বা একসাথে বেড়াতে যাওয়া, ফল যা-ই হোক।

ছোট বাচ্চার (ক্লাস ৩-৪) এত টেনশন কেন হয়?

ছোটরা প্রায়ই বড়দের মুখ দেখে বোঝে ব্যাপারটা কতটা গুরুতর। বাসায় যদি ক্লাস টেস্ট নিয়েও বড় হইচই হয়, ভয় সেখান থেকেই আসে। আপনি নিজে শান্ত থাকুন, পরীক্ষাকে "কতটা শিখলাম দেখার একটা সুযোগ" হিসেবে বলুন।

পরীক্ষার সময় কি মোবাইল পুরো বন্ধ করে দেব?

পুরো কেড়ে নিলে অনেক কিশোরের চাপ উল্টো বাড়ে, কারণ বন্ধুদের সাথে যোগাযোগই তাদের ভরসা। তার চেয়ে একসাথে নিয়ম ঠিক করুন: পড়ার সময় আর ঘুমের আগে ফোন দূরে, বিরতিতে নির্দিষ্ট সময়। স্ক্রিন নিয়ে আরও জানতে পড়ুন বাচ্চাদের স্ক্রিন টাইম ব্যবস্থাপনা।

পরীক্ষার আগে গোছানো টেবিল আর আগে থেকে তৈরি জ্যামিতি বক্স, কলম, পেনসিল শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ কমায়, আর তাতে টেনশনও খানিকটা কমে। দরকারি জিনিসগুলো দেখে নিতে পারেন নীলঘুড়ির স্টেশনারি কালেকশনে; সারা দেশে ডেলিভারি, ক্যাশ অন ডেলিভারি আর বিকাশ পেমেন্টের সুবিধা আছে।

তথ্যসূত্র

  • #পরীক্ষা
  • #মানসিক চাপ
  • #ক্লাস ৩-১২
  • #অভিভাবকত্ব
ন

নীলঘুড়ি টিম

সম্পাদনা দল

অভিভাবকদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP), ইউনিসেফ (UNICEF) ও সিডিসি (CDC)-র বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এবং স্থানীয় পারিবারিক বাস্তবতার সমন্বয়ে রচিত ও তথ্য-যাচাইকৃত।

লেখাটা ভালো লাগলে আমাদের কালেকশনও দেখে নিন।

কালেকশন দেখুন