সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি · ক্যাশ অন ডেলিভারি ও bKash
সব লেখা

শিক্ষা

শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সম্পূর্ণ গাইড (জন্ম থেকে কিশোর বয়স)

নীলঘুড়ি টিম ৮ মিনিটতথ্য যাচাইকৃত ও নির্দেশিকা সমর্থিত

জন্ম থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত, বয়স ধরে ধরে শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ার সহজ উপায়, ঘরে বইয়ের পরিবেশ আর মা-বাবার প্রশ্নের উত্তর।

রাত সাড়ে নয়টা। রান্নাঘরের কাজ শেষ, বাচ্চা সোফায় মোবাইল হাতে। আপনি একটা গল্পের বই এগিয়ে দিলেন, সে দুই পাতা উল্টে আবার ফোনের দিকে। মনে মনে ভাবছেন, "আমরা ছোটবেলায় তো বই পেলেই গোগ্রাসে পড়তাম, এ কেন পড়ে না?"

এই চিন্তা ঢাকার ফ্ল্যাটে, চট্টগ্রামে কিংবা মফস্বলে, প্রায় সব মা-বাবার। ভালো খবর হলো, শিশুর বই পড়ার অভ্যাস কোনো জন্মগত গুণ না, এটা ঘরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আর শুরু করার জন্য কোনো বয়সই খুব আগে বা খুব দেরি না।

এই লেখায় পাবেন: কেন ছোট থেকেই বই, কোন বয়সে কীভাবে পড়বেন, ঘরে বইয়ের পরিবেশ কীভাবে বানাবেন, স্ক্রিন আর ছাপা বই নিয়ে কী বলা হচ্ছে, আর শেষে একটা চেকলিস্ট।

কেন জন্ম থেকেই বই?

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP) ২০১৪ সালের নীতিমালায় শিশু চিকিৎসকদের বলেছিল, শিশুর জীবনের প্রথম বছর থেকেই পড়ার ব্যাপারে মা-বাবাকে উৎসাহ দিতে, আর জোরে পড়ে শোনানো যে মা-বাবা ও শিশুর সম্পর্ক এবং শুরুর দিকের ভাষার দক্ষতাকে সাহায্য করে, সেটা সব পরিবারকে জানাতে। ২০২৪ সালে হালনাগাদ নীতিমালায় AAP বলেছে, একসাথে বই পড়া (shared reading) শুরু হোক জন্ম থেকেই, আর চলুক অন্তত কিন্ডারগার্টেন পর্যন্ত। তাদের ভাষায়, এটা এমন এক প্যারেন্টিং অভ্যাস যা শিশুর আবেগ-সামাজিক, চিন্তাশক্তি, ভাষা ও পড়ালেখার বিকাশে সাহায্য করে।

ইউনিসেফও একই কথা বলে: শিশু ভাষা শেখে বড়দের কাছ থেকে, যাঁরা তাকে শব্দ বারবার বলে শোনান আর পড়ে শোনান। আপনার গলার আওয়াজ শুনে শুনেই সে পাতার ছবি আর অক্ষরের সঙ্গে অর্থ মেলাতে শেখে। আর এর সঙ্গে আসে একটা আরামের অনুভূতি: কোলে বসে গল্প শোনা মানে মায়ের বা বাবার পুরো মনোযোগ পাওয়া।

অর্থাৎ ছোটবেলায় বই পড়া মানে শুধু "পড়তে শেখা" না। এটা কথা বলা, মনোযোগ আর সম্পর্কের ভিত।

বয়স অনুযায়ী শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ার উপায়

০ থেকে ১২ মাস: কোলে বসিয়ে, অল্প সময়

এই বয়সে বাচ্চা গল্প বুঝবে না, কিন্তু আপনার গলা, ছবি আর ছোঁয়া, সবই তার কাছে নতুন। HealthyChildren.org (AAP-এর অভিভাবক সাইট) বলছে:

  • বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নিরিবিলি জায়গায় বসুন, চোখে চোখ রাখুন, গলার স্বর বদলে বদলে পড়ুন।
  • ঘুম বা ন্যাপের রুটিনের অংশ হিসেবে কয়েকটা শান্ত মিনিট বইয়ের জন্য রাখুন।
  • কাপড়ের বই বা মোটা বোর্ড বই বেছে নিন, কারণ এই বয়সে বাচ্চা ধরবে, টানবে, মুখে দেবে।
  • বাচ্চা বিরক্ত হলে থামুন। বই শেষ করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।
  • ৯-১১ মাসের দিকে বল, ব্লক, কাপের মতো রোজকার জিনিসের ছবির বই ভালো কাজ করে। একই বই বারবার চাইলে বিরক্ত হবেন না।

প্রথম বছরে কথা আর বোঝাপড়া কীভাবে বাড়ে, সেটা মাসে মাসে দেখতে পারেন প্রথম বছরে শিশুর বিকাশের ধাপ লেখায়।

১ থেকে ৩ বছর: আঙুল দিয়ে দেখানো আর প্রশ্ন

এই বয়সে বই হয়ে ওঠে কথা বলার খেলা। ইউনিসেফের পরামর্শ: ছবিতে আঙুল রেখে জিনিসের নাম বলুন, ছোট ছোট প্রশ্ন করুন ("বিড়ালটা কোথায়?", "কয়টা হাঁস?"), আর চরিত্র অনুযায়ী গলা বদলান। একই বই রোজ পড়তে চাইলে উৎসাহ নিয়েই পড়ুন; ইউনিসেফ বলছে, বড়দের বারবার বলা ও পড়া শব্দ থেকে শিশু ভাষা শেখে।

যদি মনে হয় বাচ্চা বয়সের তুলনায় কম কথা বলছে, শিশুর দেরিতে কথা বলা নিয়ে আমাদের লেখাটা পড়ে দেখুন, কখন অপেক্ষা করবেন আর কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন।

৩ থেকে ৬ বছর: গল্প নিয়ে গল্প

প্লে বা নার্সারিতে পড়া বাচ্চার জন্য HealthyChildren.org রাতে টিভি বন্ধ রেখে ২০-৩০ মিনিট বইয়ের জন্য রাখার কথা বলে। পড়ার সময় বাচ্চাকে ছবি আর গল্প নিজের ভাষায় বলতে দিন, রং আর আকার খুঁজতে বলুন ("নীল রঙের সব জিনিস দেখাও তো")। গল্পের মাঝখানে পাতা উল্টানোর আগে থেমে জিজ্ঞেস করুন, "এরপর কী হবে বলো তো?" গল্প শেষে মিলে একটা নতুন শেষ বানাতে পারেন।

এই বয়সেই অনেকে অক্ষর চিনতে শুরু করে। খেলার ছলে বাংলা অক্ষর চেনানোর উপায় পাবেন খেলতে খেলতে বাংলা বর্ণমালা শেখানো লেখায়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে phonics at home (ইংরেজিতে) গাইডটাও কাজে লাগবে।

৬ থেকে ১২ বছর: নিজে পড়া, তবু একসাথে পড়া

বাচ্চা নিজে পড়তে শিখলেই অনেক মা-বাবা গল্প শোনানো বন্ধ করে দেন। HealthyChildren.org ঠিক উল্টো পরামর্শ দেয়: নিজে পড়তে শেখার পরেও একসাথে পড়া চালিয়ে যান। কোনো কোনো রাতে বাচ্চাকেই বলুন আপনাকে পড়ে শোনাতে।

আরেকটা জরুরি কথা: সব পড়াই পড়া। কমিকস, ম্যাগাজিন, রান্নার বই, পত্রিকার খেলার পাতা, যা পড়তে ভালো লাগে তাই পড়তে দিন। "এসব আজেবাজে বই" বলে থামিয়ে দিলে পড়ার আনন্দটাই চলে যায়।

১২ থেকে ১৬ বছর: তার পছন্দকে সম্মান

কিশোর বয়সে কোচিং, স্কুল আর পরীক্ষার চাপে গল্পের বই প্রায় হারিয়ে যায়। এখানে চাপ না দিয়ে আগ্রহ ধরে এগোন। স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের জন্য HealthyChildren.org-এর পরামর্শ কিশোরদের বেলাতেও খাটে: সন্তান যা পড়ে, আপনিও সেটা পড়ে দেখুন, তাহলে দুজনের কথা বলার একটা বিষয় তৈরি হয়। বন্ধুদের নিয়ে ছোট একটা বুক ক্লাব হলে প্রিয় চরিত্র নিয়ে আলোচনা জমে ওঠে। জন্মদিন বা ঈদে বই উপহার দিন, ভেতরের পাতায় দুই লাইন নিজের হাতে লিখে।

ঘরে বইয়ের পরিবেশ: ছোট ফ্ল্যাটেও সম্ভব

বড় লাইব্রেরি লাগে না। লাগে কয়েকটা ছোট অভ্যাস:

  • নিজে পড়ুন। HealthyChildren.org বলছে, মা-বাবাকে পড়তে দেখলে বাচ্চারাও বই হাতে নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পত্রিকা, উপন্যাস, ধর্মীয় বই, যা-ই হোক।
  • হাতের নাগালে বই। উঁচু আলমারিতে তালাবদ্ধ বই কেউ পড়ে না। বাচ্চার উচ্চতায় একটা নিচু তাক বা ঝুড়িতে ৮-১০টা বই রাখুন, মাঝে মাঝে বদলে দিন।
  • পড়ার কোণ। জানালার পাশে একটা মাদুর, দুটো কুশন আর ভালো আলো। লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় চার্জার লাইট জ্বালিয়ে গল্প শোনানো অনেক পরিবারে প্রিয় স্মৃতি হয়ে যায়।
  • বাইরে গেলে বই। ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা, জ্যামে বসে থাকা, গ্রামের বাড়ির লম্বা যাত্রা, ব্যাগে একটা পাতলা বই রাখুন। ফোনের বদলে এটা ভালো বিকল্প।
  • নানু-দাদুকে কাজে লাগান। যৌথ পরিবারে দাদু-নানুর মুখের ছড়া আর গল্প বইয়ের মতোই দামি। তাঁদের বলুন বাচ্চাকে একটা ছড়ার বই পড়ে শোনাতে।
  • বইমেলা আর লাইব্রেরি। ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বাচ্চাকে নিয়ে যান, নিজে বই বাছতে দিন। এলাকায় পাঠাগার থাকলে সদস্য করে দিন।

কোন বয়সে কেমন বাংলা ছড়া আর গল্পের বই মানাবে, তার বিস্তারিত তালিকা আছে বয়স অনুযায়ী বাচ্চাদের বাংলা গল্পের বই লেখায়।

স্ক্রিন বনাম ছাপা বই

ট্যাবে গল্পের অ্যাপ বা ইউটিউবে গল্প, এগুলো কি বইয়ের বিকল্প? AAP-এর ২০২৪ সালের নীতিমালা ছাপা বইকেই প্রাধান্য দিয়েছে, কারণ বই হাতে একসাথে বসে কথা বলার যে আদান-প্রদান, স্ক্রিনে সেটা সাধারণত হয় না।

তার মানে এই না যে স্ক্রিন একেবারে নিষিদ্ধ। মূল কথা হলো, বইয়ের সময়টা যেন মানুষের সঙ্গে হয়। স্ক্রিন টাইম কতটা আর কীভাবে সামলাবেন, সেটা নিয়ে আলাদা করে লিখেছি শিশুর স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ লেখায়।

যা করবেন, যা এড়াবেন

করবেনএড়াবেন
রোজ একই সময়ে অল্প করে পড়ুনমাসে একদিন দুই ঘণ্টা পড়ানো
বাচ্চাকে বই বাছতে দিন"এটা তোমার বয়সের বই না" বলে কেড়ে নেওয়া
একই বই বারবার পড়ুন"এটা তো আগেই পড়েছ" বলে বিরক্তি
প্রশ্ন করুন, গল্প নিয়ে কথা বলুনপ্রতিটা শব্দের বানান ধরা
বই পড়াকে আদরের সময় বানানশাস্তি হিসেবে বই পড়তে বসানো

শিশুর বই পড়ার অভ্যাস: ৮ ধাপের চেকলিস্ট

  1. প্রতিদিনের রুটিনে একটা নির্দিষ্ট "বইয়ের সময়" ঠিক করুন, সাধারণত ঘুমের আগে।
  2. বয়স অনুযায়ী বই রাখুন: শিশুর জন্য কাপড়/বোর্ড বই, বড়দের জন্য গল্প, কমিকস, তথ্যের বই।
  3. বাচ্চার উচ্চতায় একটা তাক বা ঝুড়িতে বই রাখুন।
  4. পড়ার সময় টিভি আর ফোন বন্ধ রাখুন।
  5. ছবিতে আঙুল দিয়ে দেখান, প্রশ্ন করুন, গল্পের পরে কী হতে পারে জিজ্ঞেস করুন।
  6. বাচ্চা নিজে পড়তে পারলেও মাঝে মাঝে জোরে পড়ে শোনান, কখনো তাকে দিয়ে শোনান।
  7. বইমেলা, লাইব্রেরি বা জন্মদিনে বই উপহার দিয়ে বইকে আনন্দের সঙ্গে জুড়ে দিন।
  8. নিজে পড়ুন, যাতে বাচ্চা দেখে বই বড়দেরও জিনিস।

প্রশ্নোত্তর

কত মাস বয়স থেকে বাচ্চাকে বই পড়ে শোনানো শুরু করব?

জন্ম থেকেই। AAP-এর ২০২৪ সালের নীতিমালা জন্ম থেকে শুরু করে অন্তত কিন্ডারগার্টেন পর্যন্ত একসাথে বই পড়তে উৎসাহ দেয়। নবজাতক অর্থ না বুঝলেও আপনার গলার স্বর, কোলের উষ্ণতা আর ছবি তার ভালো লাগে। শুরুতে দিনে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট।

বাচ্চা একদম বসে থাকতে চায় না, বই ছিঁড়ে ফেলে। কী করব?

ছোট বাচ্চার জন্য এটা খুব স্বাভাবিক আচরণ। মোটা বোর্ড বই বা কাপড়ের বই দিন, যা সহজে ছেঁড়ে না। পুরো বই শেষ করার দরকার নেই; এক-দুই পাতা দেখিয়ে থামুন, বাচ্চা হাঁটাহাঁটি করলেও পড়ে যান। ধীরে ধীরে বসে থাকার সময় বাড়বে।

আমার সন্তান শুধু কমিকস পড়ে। এটা কি পড়া হিসেবে ধরব?

হ্যাঁ। HealthyChildren.org স্পষ্ট বলছে, কমিকস, ম্যাগাজিন, রান্নার বই, সব পড়াই পড়া। পড়তে ভালো লাগার অভ্যাসটাই আসল, ধরন পরে আস্তে আস্তে বদলায়। পাশাপাশি তার পছন্দের বিষয়ের একটা গল্পের বই রেখে দিতে পারেন।

ক্লাস সিক্সে ওঠার পর ছেলে আর গল্পের বই ধরে না। এখন কি দেরি হয়ে গেছে?

না। কিশোর বয়সে পড়ার অভ্যাস ফেরাতে তার আগ্রহের বিষয় খুঁজুন: খেলা, বিজ্ঞান, রহস্য, ইতিহাস। আপনি নিজেও বইটা পড়ে তার সঙ্গে আলোচনা করুন। বন্ধুদের সঙ্গে বই অদলবদল বা ছোট বুক ক্লাবও কাজে দেয়।

ট্যাবে ই-বুক বা অডিওবুক কি চলবে?

AAP-এর ২০২৪ সালের নীতিমালা ছোট শিশুর জন্য ছাপা বইকে প্রাধান্য দেয়, কারণ একসাথে বসে বই পড়ায় যে কথোপকথন আর সম্পর্ক তৈরি হয়, স্ক্রিনে সেটা সাধারণত হয় না। বড় বাচ্চার জন্য অডিওবুক গল্প শোনার একটা বাড়তি উপায় হতে পারে, তবে ছাপা বইয়ের বিকল্প হিসেবে নয়। মূল কথা, বইয়ের সময়টা যেন আপনার সঙ্গে কাটে।

এই সপ্তাহেই শুরু করতে চাইলে নীলঘুড়ির বইয়ের কালেকশন দেখে নিতে পারেন। ছোট্ট শিশুর জন্য কাপড় আর বোর্ড বই খুঁজলে ০-১২ মাসের কালেকশন, আর স্কুলপড়ুয়া পাঠকের জন্য ৬+ বছরের কালেকশন কাজে লাগবে। সারা দেশে ডেলিভারি হয়, ক্যাশ অন ডেলিভারি আর বিকাশে পেমেন্ট করা যায়।

তথ্যসূত্র

  • #বই পড়া
  • #শিশুর ভাষা
  • #প্যারেন্টিং
  • #০-১৬ বছর
ন

নীলঘুড়ি টিম

সম্পাদনা দল

অভিভাবকদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP), ইউনিসেফ (UNICEF) ও সিডিসি (CDC)-র বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এবং স্থানীয় পারিবারিক বাস্তবতার সমন্বয়ে রচিত ও তথ্য-যাচাইকৃত।

লেখাটা ভালো লাগলে আমাদের কালেকশনও দেখে নিন।

কালেকশন দেখুন