সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি · ক্যাশ অন ডেলিভারি ও bKash
সব লেখা

প্যারেন্টিং

নবজাতকের ঘুম নিরাপদ রাখবেন যেভাবে: বিছানা, শোয়ানোর ভঙ্গি ও সাধারণ ভুল

নীলঘুড়ি টিম ৭ মিনিটতথ্য যাচাইকৃত ও নির্দেশিকা সমর্থিত

চিত করে শোয়াবেন না কাত করে? বালিশ লাগবে কি? নবজাতকের নিরাপদ ঘুম নিয়ে AAP ও NHS-এর নির্দেশনা সহজ ভাষায়, বাংলাদেশের ঘরের বাস্তবতা মিলিয়ে।

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার প্রথম রাতেই অনেক বাবা-মা ঘুমাতে পারেন না। বাবু ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে তো? নানু বলছেন কাত করে শোয়াতে, যাতে দুধ তুললে গলায় না আটকায়; দাদু বলছেন মাথার নিচে নরম সরষের বালিশ দিতে, তাহলে মাথা গোল হবে। কার কথা শুনবেন?

নবজাতকের ঘুম নিয়ে আন্তর্জাতিক শিশু স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পরামর্শ আসলে বেশ পরিষ্কার, আর মূল কথাগুলো মনে রাখা সহজ: শিশু ঘুমাবে চিত হয়ে, একা, আর ফাঁকা ও শক্ত বিছানায়। এই লেখায় আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (AAP) আর যুক্তরাজ্যের NHS-এর নির্দেশনা ধরে দেখব কীভাবে শোয়াবেন, বিছানায় কী রাখবেন, আর আমাদের ঘরে প্রচলিত কোন অভ্যাসগুলো বদলানো দরকার।

একটা কথা আগেই বলে রাখি: এটা দোষ ধরার লেখা নয়। আমাদের মা-খালারা যেভাবে শিখেছেন, সেভাবেই ভালোবেসে করেছেন। নির্দেশনা সময়ের সঙ্গে বদলেছে, এটুকুই।

নবজাতকের ঘুমের তিনটি মূল নিয়ম

AAP-এর নিরাপদ ঘুমের নির্দেশনা আর NHS-এর পরামর্শ মিলিয়ে মূল নিয়ম তিনটি:

  1. চিত করে শোয়ান, প্রতিবার। AAP বলছে এক বছর পর্যন্ত শিশুকে রাতের ঘুম ও দিনের ছোট ঘুম, দুই সময়েই পিঠের ওপর শোয়াতে হবে। NHS-ও স্পষ্ট বলছে কাত করে বা উপুড় করে শোয়াবেন না।
  2. শক্ত, সমতল, ফাঁকা বিছানা। শিশুর বিছানা হবে শক্ত ও সমতল। ১০ ডিগ্রির বেশি ঢালু কোনো জায়গায় (ঢালু স্লিপার, নরম পাশবালিশ ধরনের "নেস্ট") শিশুকে ঘুমাতে দেবেন না। ওপরে শুধু টানটান করে লাগানো একটা চাদর; আর কিছু নয়।
  3. একই ঘরে, কিন্তু আলাদা বিছানায়। AAP অন্তত প্রথম ছয় মাস বাবা-মায়ের ঘরে, তবে আলাদা বিছানায় শিশুকে রাখার পরামর্শ দেয়। NHS-ও বলছে অন্তত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশু যেন বাবা-মায়ের একই ঘরে ঘুমায়।

বিছানায় কী থাকবে, কী থাকবে না

আমাদের ঘরে শিশুর বিছানা মানেই নরম তোশক, তার ওপর কাঁথা, মাথার নিচে বালিশ, দুই পাশে পাশবালিশ। দেখতে আরামদায়ক, কিন্তু নবজাতকের জন্য এগুলোই ঝুঁকির।

AAP-এর পরামর্শ অনুযায়ী শিশুর ঘুমের জায়গায় নরম বিছানাপত্র, বালিশ, কম্বল, পুতুল বা বাম্পার রাখা যাবে না, কারণ এগুলো মুখ ঢেকে দম আটকানোর ঝুঁকি তৈরি করে। NHS-ও বলছে ম্যাট্রেস হবে শক্ত, সমতল আর খাটের মাপে একদম খাপে খাপ, যাতে পাশে কোনো ফাঁক না থাকে।

যা রাখবেন

  • শক্ত, সমতল ম্যাট্রেস (চাপ দিলে দেবে যায় না এমন)
  • ম্যাট্রেসের মাপে টানটান ফিটেড চাদর
  • প্রয়োজনে পাতলা স্লিপিং ব্যাগ বা হালকা পোশাক

যা রাখবেন না

  • বালিশ, সরষের বালিশ বা মাথার নিচে ভাঁজ করা কাপড়
  • পাশবালিশ বা দুই পাশে কাঁথা গুঁজে দেওয়া "দেয়াল"
  • পুতুল, নরম খেলনা, খাটের চারপাশের বাম্পার
  • মোটা লেপ বা ভারী কম্বল

মাথার আকৃতি নিয়ে চিন্তা থাকলে বালিশ না দিয়ে শিশু জেগে থাকার সময় নজরদারিতে উপুড় করে খেলতে দিন (টামি টাইম)। AAP বলছে জেগে থাকা অবস্থায় বড় কেউ পাশে থেকে টামি টাইম করালে পেশির বিকাশে সাহায্য হয় আর মাথার পেছন চ্যাপ্টা হওয়া ঠেকাতেও কাজে দেয়। মাথার আকৃতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে শিশুর চিকিৎসককে দেখান।

শোয়ানোর ভঙ্গি: কাত করে কেন নয়?

অনেকে ভয় পান, চিত করে শোয়ালে বমি বা দুধ তুললে গলায় আটকে যাবে। AAP-এর নির্দেশনায় এক বছর পর্যন্ত প্রতিটি ঘুমে চিত করে শোয়ানোর কথাই বলা হয়েছে; শিশুর রিফ্লাক্স বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে শোয়ানোর ভঙ্গি নিয়ে আলাদা কিছু করার আগে অবশ্যই শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

NHS আরও একটা সহজ কৌশল বলে: "পা পায়ের দিকে" (feet to foot)। অর্থাৎ শিশুকে এমনভাবে শোয়ান যাতে তার পা খাট বা দোলনার নিচের প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে। এতে সে নড়াচড়া করে চাদরের নিচে ঢুকে যেতে পারে না।

শিশু যখন নিজে নিজে পাশ ফিরতে শিখবে (সাধারণত প্রথম বছরের মাঝামাঝি), তখন কী হবে? NHS বলছে শিশু ঘুমের মধ্যে গড়িয়ে গেলে তাকে আবার চিত করে দিন, যতক্ষণ না সে নিজে দুই দিকেই (চিত থেকে উপুড় আর উপুড় থেকে চিত) গড়াতে পারে। শোয়ানোর সময় সবসময় চিত করেই শোয়াবেন। AAP-এর মতে কাত হয়ে শোয়াও উপুড় হয়ে শোয়ার মতোই বিপজ্জনক, কারণ কাত থেকে সহজে উপুড় হয়ে যেতে পারে। কোন মাসে শিশু গড়াগড়ি দিতে শেখে, তা দেখতে পারেন প্রথম বছরে শিশুর বিকাশের ধাপ লেখায়।

এক বিছানায় ঘুম নিয়ে কী বলা হয়

বাংলাদেশে মা আর শিশু এক বিছানায় ঘুমাবে, এটাই স্বাভাবিক ধরা হয়। অনেক বাসায় আলাদা খাট রাখার জায়গাও থাকে না। তবু জেনে রাখা দরকার, AAP কোনো অবস্থাতেই শিশুর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমানোর (bed-sharing) পরামর্শ দেয় না, যমজ শিশুর ক্ষেত্রেও না। NHS-ও কিছু ক্ষেত্রে (যেমন অকালে জন্ম, কম ওজন, বাবা-মায়ের ধূমপান বা মদ্যপান) এক বিছানায় ঘুমাতে নিষেধ করে। তাদের পরামর্শ: একই ঘরে, কিন্তু শিশুর আলাদা ঘুমের জায়গা।

জায়গা কম হলে কী করবেন:

  • খাটের পাশে হাতের নাগালে শক্ত তলার ছোট দোলনা, বেসিনেট বা শিশুর খাট রাখুন, যাতে রাতে হাত বাড়িয়েই শিশুকে ধরা যায়
  • রাতে বুকের দুধ খাওয়ানোর পর শিশুকে আবার তার নিজের জায়গায় শুইয়ে দিন
  • মা বা বাবা যদি ধূমপান করেন, মদ বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকেন, কিংবা শিশু অকালে জন্মানো বা কম ওজনের হয়, তাহলে কোনোভাবেই এক বিছানায় ঘুমাবেন না

আপনার পরিবারের অবস্থা অনুযায়ী কোনটা সম্ভব, তা নিয়ে শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন।

সোফা, দোলনা আর কার সিটে ঘুম

ক্লান্ত বাবা শিশুকে বুকে নিয়ে সোফায় বসে আছেন, দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লেন। এই দৃশ্যটা খুব চেনা, কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকির একটি। AAP আর NHS দুই সংস্থাই বলছে সোফা, নরম আর্মচেয়ার বা কুশনে শিশুকে নিয়ে ঘুমাবেন না; AAP-এর মতে এতে ঘুমের সময় শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। খুব ক্লান্ত লাগলে ঘুমিয়ে পড়ার আগেই শিশুকে তার শক্ত, সমতল বিছানায় চিত করে শুইয়ে দিন, বা অন্য কাউকে শিশুকে দেখে রাখতে বলুন।

AAP বলছে কার সিট, স্ট্রলার, দোলনা বা ঝোলানো দোলায় শিশু ঘুমিয়ে পড়লে যত দ্রুত সম্ভব তাকে শক্ত, সমতল বিছানায় সরিয়ে নিতে। দোলনায় দুলিয়ে ঘুম পাড়াতে পারেন, কিন্তু ঘুমিয়ে গেলে বিছানায় শোয়ান।

গরমে আর শীতে: তাপমাত্রা ঠিক রাখা

বাংলাদেশে বছরের বেশিরভাগ সময় গরম, আবার শীতের রাতে ঠান্ডাও পড়ে। দুই সময়েই মূল কথা একটাই: শিশু যেন অতিরিক্ত গরম না হয়।

NHS বলছে শিশুর ঘরের তাপমাত্রা মোটামুটি ১৬ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ভালো। শিশুর হাত-পা একটু ঠান্ডা লাগা স্বাভাবিক, তাই গরম না ঠান্ডা বুঝতে বুক বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিন। ঘেমে গেলে এক স্তর কাপড় বা চাদর সরিয়ে দিন। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকলে টুপি আর বাড়তি কাপড় খুলে দিতেও বলে NHS।

গরমের দিনের জন্য বাস্তব কিছু টিপস:

  • পাতলা সুতির জামা পরান, ঘুমের সময় টুপি নয়
  • ঘর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করুন, শিশুকে বাড়তি কাপড়ে মুড়ে রাখবেন না
  • লোডশেডিংয়ে ঘর গরম হয়ে গেলে কাপড় কমিয়ে দিন, মোটা কাঁথা সরিয়ে রাখুন

শীতে মোটা লেপ বা কাঁথার স্তূপের বদলে শিশুকে স্তরে স্তরে কাপড় পরান, যাতে বিছানায় আলগা ভারী কিছু না থাকে।

মশারি, ধোঁয়া আর আমাদের ঘরের বাস্তবতা

  • মশারি: মশারি ভালো করে টানটান করে খাটান, যাতে তা ঝুলে শিশুর মুখের কাছে না আসে।
  • ধোঁয়া: শিশুর আশপাশে, বিশেষ করে ঘরের ভেতরে কেউ যেন ধূমপান না করেন। WHO-র তথ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের ধূমপান শিশুর নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ানোর একটি কারণ।
  • গলায় সুতা বা চেইন: AAP শিশুকে কোনো গয়না না পরাতে বলে, কারণ এতে দম আটকানো বা গলায় পেঁচিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ঘুমের সময় এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকুন।

রাতের চেকলিস্ট (প্রিন্ট করে রাখতে পারেন)

  • শিশুকে চিত করে শুইয়েছি
  • বিছানা শক্ত ও সমতল, শুধু একটা ফিটেড চাদর
  • বালিশ, পাশবালিশ, খেলনা কিছু নেই
  • পা খাটের নিচের প্রান্ত ছুঁয়ে আছে
  • শিশু আমার ঘরেই, কিন্তু তার নিজের বিছানায়
  • শিশু ঘামছে না, মাথায় টুপি নেই
  • মশারি টানটান, মুখের ওপর ঝুলছে না

ঘুমের রুটিন বানাতে চাইলে আমাদের ঘুমের সময়সূচি টুল দেখতে পারেন। আর একটু বড় হলে ঘুমের আগে ছোট্ট বই পড়ার অভ্যাস কীভাবে শুরু করবেন, তা আছে শিশুর বই পড়ার অভ্যাস গাইডে।

প্রশ্নোত্তর

নবজাতককে কাত করে শোয়ানো কি নিরাপদ?

না। AAP ও NHS দুই সংস্থাই বলছে এক বছর পর্যন্ত প্রতিটি ঘুমে শিশুকে চিত করে শোয়াতে হবে, কাত করে বা উপুড় করে নয়। শিশুর বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে শোয়ানোর ভঙ্গি নিয়ে তার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

সরষের বালিশ দিলে কি মাথা গোল হয়?

নবজাতকের ঘুমের জায়গায় কোনো বালিশই রাখার পরামর্শ নেই, কারণ নরম জিনিস দম আটকানোর ঝুঁকি বাড়ায়। মাথার পেছন চ্যাপ্টা হওয়া ঠেকাতে AAP জেগে থাকার সময় নজরদারিতে টামি টাইমের পরামর্শ দেয়।

কতদিন শিশুকে নিজের ঘরে রাখব?

AAP অন্তত প্রথম ছয় মাস একই ঘরে আলাদা বিছানায় রাখার কথা বলে। NHS-ও ছয় মাস বয়স পর্যন্ত একই ঘরে রাখার পরামর্শ দেয়।

শিশু ঘুমের মধ্যে উপুড় হয়ে গেলে কী করব?

NHS বলছে শিশু ঘুমের মধ্যে গড়িয়ে গেলে তাকে আবার চিত করে দিন, যতক্ষণ না সে নিজে দুই দিকেই গড়াতে শেখে। প্রতিবার শোয়ানোর সময় চিত করেই শোয়াবেন, আর বিছানা ফাঁকা রাখবেন।

ঘুমের সময় শিশুর শরীর বেশি গরম কি না কীভাবে বুঝব?

হাত-পা নয়, বুক বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে দেখুন। ঘাম থাকলে এক স্তর কাপড় বা চাদর কমিয়ে দিন। শিশুর জ্বর আছে মনে হলে বা নিস্তেজ লাগলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যান।

নিরাপদ ঘুমের জন্য প্রস্তুতি

নিরাপদ ঘুমের জন্য খুব বেশি কিছু লাগে না: একটা আলাদা বিছানা, একটা শক্ত ম্যাট্রেস আর কয়েকটা ফিটেড চাদর। পুরো কেনাকাটার তালিকা পাবেন নবজাতকের প্রয়োজনীয় জিনিসের চেকলিস্টে। নীলঘুড়ির বেবি এসেনশিয়ালস কালেকশনে শিশুর দরকারি জিনিস দেখে নিতে পারেন; সারা দেশে ডেলিভারি, ক্যাশ অন ডেলিভারি ও বিকাশে পেমেন্টের সুবিধা আছে।

তথ্যসূত্র

  • #নবজাতক
  • #নিরাপদ ঘুম
  • #শিশুর যত্ন
  • #০-১২ মাস
ন

নীলঘুড়ি টিম

সম্পাদনা দল

অভিভাবকদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP), ইউনিসেফ (UNICEF) ও সিডিসি (CDC)-র বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা এবং স্থানীয় পারিবারিক বাস্তবতার সমন্বয়ে রচিত ও তথ্য-যাচাইকৃত।

লেখাটা ভালো লাগলে আমাদের কালেকশনও দেখে নিন।

কালেকশন দেখুন